ফ্রি সার্ভিস কি আসলেই ফ্রি?
ফ্রি শব্দটা শুনলেই কেমন যেন খুশি হয়ে যাই আমরা তাই না?
এই খুশির সুত্র ধরেই বিভিন্ন কোম্পানি বাইক বিক্রির সময় নির্দিষ্ট মেয়াদে কিছু ফ্রি-সার্ভিস অফার করে।
কিন্ত কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সার্ভিস গুলো আসলেই ফ্রি কিনা??
না, কখনোই ফ্রি নয়,
সার্ভিসের চার্জগুলো বাইকের দামের সাথেই হিডেন ভাবে যোগ করা থাকে। তাই ফ্রি সার্ভিস পেলে খুশিতে লাফ দেয়ার কোনো কারন নেই বরং এটা বাইক ক্রেতার অধিকার।
খেয়াল করে দেখবেন ফ্রি সার্ভিস দেয়ার ব্যাপারটিকে অফিসিয়াল এবং আন অফিসিয়ালের প্যাচ মোচড় দিয়ে বাইকের পরিবেশক এমন ভাবে উপস্থাপন করেন যাতে করে মনে হবে আপনাকে অতিরিক্ত আদর আপ্যায়ন করা হচ্ছে, কোম্পানি আপনার প্রতি খুবই যত্নবান। আপনার বাইকের জন্য তারা মহা চিন্তিত।
অবশ্য এর পেছনে যৌক্তিক কারনও আছে।
মুলত এই ফ্রি সার্ভিসের আড়ালেই রয়েছে বিরাট ব্যাবসায়িক ফাদ।
একটা ছোট গল্পের মাধ্যমে উদাহরণটা দিলে আরো ভালোভাবে বুঝবেন।।
প্রথমে যখন এই উপমহাদেশে চায়না থেকে চা ব্যাবসায়ীরা চা বিক্রি করতে এসেছিলো তখন কেউই চা খেতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেনি।
একপর্যায়ে চায়নারা ফ্রি তে চা খাওয়ানো শুরু করলো এবং চায়ের উপকারিতা সম্পর্কে মানুষকে মোটিভেশন দেয়া শুরু করলো।
বিভিন্ন ভাবে প্রচার প্রচারণা আর বিজ্ঞাপন দেয়া শুরু করলো।
কিছুদিনের মধ্যেই মানুষের মধ্যে চা খাওয়ার অভ্যস্ততা তৈরি হলো এবং বর্তমানে চায়ের ব্যাবসা কতটা লাভজনক সেটা আশা করি ব্যাখ্যা করে বুঝাতে হবে না।
অলিতে গলিতে আর কিছু না থাক, চায়ের দোকান পাবেন না এটা অসম্ভব।
বিভিন্ন ফ্লেভার, বিভিন্ন নাম এবং দামে বাহারী চা খাচ্ছি উচ্চমুল্যে।
অপরদিকে চা খেতে যে পরিমাণ সময়, এফোর্ড আর পয়সা খরচ করছি তার বিপরীতে আমাদের লসের অংক কিন্ত বিরাট।
তাছাড়া চা তে এমন আহামরি কোনো জীবন রক্ষাকারী উপাদান আছে বলেও কোনো রিসার্চ নেই।
উপকারীতা থাকলেও তা খুব সামান্য।
বরং অতিরিক্ত চা পানে ক্ষুধামন্দা, অনিদ্রা, শরীর কড়া হওয়া সহ নানান জটিলতা রয়েছে।
কিন্ত চায়ের সাথে সম্পৃক্ত কাউকেই চা পানের ক্ষতিকর দিক বা সমস্যা হাইলাইট করতে দেখবেননা,
বরং চা খেলে কি লাভ, কোন ব্রান্ডের চা খেলে কতটা চাংগা লাগে এসব দিকেই ফোকাস দিতে দেখবেন কারন পাবলিকের ব্রেইন ওয়াশ করতে পারলে চায়ের সেল বাড়ে, লাভ বেশি হয়।
একইভাবে শুরুতে ফ্রি সার্ভিস (আসলে ফ্রি নয়) দিয়ে অভ্যস্ততা তৈরি করা হয়।
কারন ফ্রি শুনলে আমরা নতুন লুংগি পেতে আলকাতরা নিতেও লাইনে দাঁড়িয়ে ধাক্কাধাক্কি করি এটা খুব কমন ঘটনা।
ফ্রি সার্ভিসে নিতে গেলে আমাদেরকে বিভিন্নভাবে বুঝানো হয়, রেগুলার সার্ভিস না করালে বাইকের বিরাট আকারের ক্ষতি হবে, একমাত্র তাদের সার্ভিস সেন্টার ছাড়া
পৃথিবীর আর কোথাও জেনুইন পার্টস পাওয়া যায়না, অথোরাইজড সার্ভিস সেন্টার ছাড়া অন্য কোনো সার্ভিস সেন্টারে সার্ভিস করালে তারা আর কোনো ওয়ারেন্টি দেবেনা ইত্যাদি ভয়ভীতিও দেখানো হয়।
বাইরে থেকে কোনো পার্টস কিনে নিয়ে গেলে সেটাও তারা লাগিয়ে দেবেনা। বলবে সেটা নকল পার্টস। অর্থাৎ তাদের কাছ থেকেই পার্টস কিনতে বাধ্য করবে আপনাকে।
আদতে একটা ব্রান্ড নিউ বাইকে প্রথম এক বছরে ফ্রি সার্ভিসের নামে তারা কি কি সার্ভিস করে কখনো খেয়াল করে দেখেছেন?
ইঞ্জিন অয়েল চেঞ্জ,
অয়েল ফিল্টার চেঞ্জ,
বড় নাট বোল্ট গুলা চেক করা,
চেইনে লুব দেয়া আর ওয়াশ ছাড়া আর কোনো বিশেষ সার্ভিস কি আসলেই তারা করে?
অবশ্য নতুন বাইকে এর চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজনও হয়না।
বরং বেশি বেশি খোলা ফিটিং হলেই বাইকে নানান রকম ইস্যু ক্রিয়েট হয়।
তাছাড়া কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারে গেলেই দেখবেন নানান উসিলায় পার্টস সেল করার একটা প্রবনতা থাকে। মুলত ব্যাবসাটা ওই পার্টস সেলের মধ্যেই।
বাইক বিক্রি করে লাভ করে একবার, কিন্ত পার্টস বানিজ্য চলতেই থাকে বছর জুড়ে।
যে কোম্পানিকে যতবেশি সার্ভিস সেন্টার আর জেনুইন পার্টস নিয়ে হাইলাইট করতে দেখবেন বুঝে নেবেন তাদের বাইকের বিল্ড কোয়ালিটি তত দুর্বল।
যদি বাইকের বিল্ড কোয়ালিটি ভালো হয়, পার্টস কোয়ালিটি ভালো হয় তাহলে একটা বাইকে অতিরিক্ত সার্ভিস এবং স্পেয়ার পার্টস লাগা খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা।
তবে হ্যা, কিছু বেসিক কনজুমেবল পার্টস লাগবেই, যেমন, ব্রেক প্যাড, অয়েল ফিল্টার, এয়ার ফিল্টার, ক্লাচ ক্যাবল, চেইন স্প্রকেট, টায়ার ইত্যাদি।
যদি দেখেন কোনো কোম্পানি ফ্রি সার্ভিস নেয়ার জন্য বারবার ফোন করে রিমাইন্ডার দিচ্ছে তখন তাদেরকে বন্ধু ভাবার কোনো কারন নেই।
কেননা তারা যদি বন্ধুই হতো তাহলে পার্টসের দাম ৩-৪ গুন বেশি না নিয়ে রিজনেবল রাখতো এবং ভালো বিল্ড কোয়ালিটির বাইক দিয়ে আমাদের মেইন্টেনেন্স খরচ কমিয়ে দিতো।
তাহলেই ঘন ঘন সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে আমাদের সময় এবং টাকার অপচয় করতে হতো না।
বাস্তবতার সাথে পোস্টের মিল খুজে পেলে পোস্টটি শেয়ার করতে পারেন।
আর অবশ্যই বাইক কেনার আগে সার্ভিস এবং পার্টস বানিজ্যের ব্যাপারে খোজ খবর নেবেন।
ফ্রি সার্ভিস নিতে গিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো কমেন্টে লিখে জানাতে পারেন।
ভালো থাকুক আপনার বাইক।
হ্যাপি বাইকিং।
লেখাঃ ইকবাল আব্দুল্লাহ রাজ
এডমিন, Bike Doctor BD