ইঞ্জিন অয়েল কখন চেঞ্জ করা উচিত?

⛔⛔কেন বাংলাদেশে ইঞ্জিন অয়েল দীর্ঘ ড্রেন পিরিওড নিয়ে চালানো উচিত নাঃ⛔⛔

অলমোস্ট প্রতিটা বাইকের ম্যানুয়ালে লিখা আছে মিনারেল অয়েল ৩০০০+ কি.মি. পরে ড্রেন দিতে, ফুল সিন্থেটিক অয়েল ৬০০০-৭০০০কি.মি. পর পর ড্রেন দিতে বলে অয়েল কোম্পানি। কিছু কোম্পানিত মিনারেল অয়েলও ১০,০০০কি.মি. চালাতে পরামর্শ দিয়েছে। 

ম্যানুয়ালের এই নির্দিষ্ট সাজেশনটি আমাদের দেশে মানা উচিত নয় এবং কেন উচিত নয় সেই বিষয়ে আজকে আলোচনা করবো। সাথে আলোচনা করবো ম্যানুয়ালে কেন এত লম্বা ড্রেন পিরিওড লিখা থাকে।।

যেকোন ইঞ্জিন অয়েল চলতে চলতে  Blow by effect, Oxidation, Contamination mixup, Visocity Modifier Additive brake Down এইসব ইসুর কারনে  ভিস্কোসিটি কমতে থাকে, এটা নরমাল প্রসেস।

আর বাংলাদেশে বৈরি কন্ডিসনের কারনে এই ভিস্কোসিটি কমা আরো দ্রুত হয়। তাই লম্বা ড্রেন পিরিওড মানা একদম অনুচিত।









কারণ সমূহঃ

♨️⛽ভয়াবহ ভেজাল ফুয়েল! 

আমাদের দেশে ভয়াবহ লেভেলের  ভেজাল ফুয়েলের কারনে অয়েলের ড্রেন পিরিওড মাস্ট কমাতে হবে রিকমেন্ডেড থেকে। 

ভেজাল ফুয়েলে সাধারনত কেরসিন,তারপিন, ডিজেল জাতীয় অয়েল মিক্স করা থাকে। এই জিনিস গুলো সহজে বার্ন হতে চায় না,লিকুইড ফর্মেই থেকে যায়। এই লিকুইড ভেজাল জিনিস পিস্টন রিং লিক করে পিস্টনের নিচে চলে এসে ইঞ্জিন অয়েলে মিক্স হয়। (কম্বাশন চ্যাম্বার থেকে পিস্টন রিং লিক করে অয়েল বা অন্য কিছু পিস্টনের নিচে ইঞ্জিন অয়েলে চলে আসার ঘটনাকে Blow By Effect বলে)। 

(ফুয়েল অরিজিনাল ভেজাল মুক্ত হলেও এই ব্লো বাই এফেক্টের কারনে অক্টেন পেট্রল ইঞ্জিন অয়েলে মিশে,এতে অয়েলের ভিস্কসিটি কমতে থাকে)

ফলে ক্রমাগত ইঞ্জিন অয়েলে এই ভেজাল উপাদান মিক্স হতে হতে ভিস্কোসিটি দ্রুত কমিয়ে দেয় ইঞ্জিন অয়েলের,তাই নির্ধারিত ড্রেন পিরিওড রাখা খুবই বিপজ্জনক।

এছাড়া আমাদের দেশের গ্যাসলিনে (অক্টেন /পেট্রল)  সালফার কন্টামিনেশন  বেশি। সালফার উচ্চ তাপমাত্রায় অক্সিজেনের সাথে রিএকশন করে সাল্ফিউরিক এসিড ক্রিয়েট করে, যেটা ইঞ্জিনের ধাতু ক্ষয় করে,সাথে ইঞ্জিন অয়েলের ড্যামেজ করে।

এই সালফিউরিক এসিডকে দূর করার জন্য ইঞ্জিন অয়েলে ক্ষার মিক্স করা থাকে, এর ভ্যালুকে বলে হয় TBN value (Total base number)  

এখন সালফার বেশি  থাকাতে এসিড বেশি ক্রিয়েট হয়, TBN দ্রুত কমতে থাকে অই এসিড প্রশমিত করতে।  

তাই নির্ধারিত ড্রেন পিরিওডের আগেই TBN ভ্যালু দ্রুত কমে যায়। তাই কাংক্ষিত ড্রেন পিরিওড রাখা উচিত না।  এর অনেক আগেই ড্রেন দিতে হবে মাস্ট! 

♨️☀️🌡️বেশি গরম আর উচ্চ আদ্রতা বিশিষ্ট  আবহাওয়ার কারণেঃ আমাদের বাংলাদেশ অস্বাভাবিক গরম  আর আদ্র ওয়েদার। জলীয় বাষ্প বেশি থাকে বাতাসে। 

জলীয় বাষ্প মানে কিন্ত পানি।   

ইঞ্জিন কম্বাশনে বাষ্পেরত কিছু হয় না, সেটাও  Blow By  এফেক্টের কারনে  পিস্টনের নিচে ইঞ্জিন অয়েলে চলে আসে। সো সোজা হিসাব ইঞ্জিন অয়েলে পানি মিক্স হতে থাকে।

আর উচ্চ তাপমাত্রায় ইঞ্জিন অয়েলের  মলিকুলের ভাংগন (অক্সিডেশন প্রসেস) দ্রুত হয়। এইজন্য শীতে একটা অয়েল লং ড্রেন পিরিওডে চালালেও বাইক স্মুথ থাকে,বাট গরমে অল্প কিছু চালালেই মনে হয় অয়েল গান্দা হয়ে গেছে। 


♨️ 🏜️বাংলাদেশের অস্বাভাবিক ধুলাবালি ঃ 

যদিও ইঞ্জিনে বাতাস ঢুকার যায়গাতে এয়ার ফিল্টার আছে। কিন্তু কোন ফিল্টারই ১০০% ফিল্টার করতে পারে না। ছোট ধুলা পার্টিকেল যত  বেশি থাকবে বাতাসে,তত  সেটা এয়ারফিল্টার ভেদ করে ইঞ্জিনে যাবে

এটাও ব্লো বাই এফেক্টে ইঞ্জিন অয়েলে মিশে। 

বিভিন্ন ইঞ্জিন অয়েলের ল্যাব টেস্টে  ব্যবহৃত অয়েলের টেস্ট রিপোর্টে যে সিলিকন,সোডিয়াম  পার্টিকেল পাওয়া যায়,অইগুলাই মুলত ধুলাবালির উপস্থিতি প্রমাণ  করে ।  বালু মুলত সিলিকন

 ডাই-অক্সাইড।


♨️🚦আমাদের দেশের ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম!

এই ইসুর জন্য আমি ঢাকা সিটির জন্য একটা ড্রেন পিরিওড বলি আর ঢাকার বাইরের জন্য আরো বেশি ড্রেন পিরিওড বলি। 

হেভি ট্রাফিক জ্যামের জন্য আমাদের অল্প গিয়ারে বাইক চালাতে হয়,ফলে ইঞ্জিন হাই রেভ হচ্ছে,বাট বাইক কিন্তু অল্প আগাচ্ছে।  

এছাড়া বার বার গিয়ার শিফট আর ক্লাচ পুল করার কারনে ক্লাচ ক্ষয় বেশি হয়,যেটা আল্টিমেটলি ইঞ্জিন অয়েলেই মিশে। 

জনপ্রিয় চ্যানেল Scotty Kilmer একটা ভিডিওতে বলেছে  হাই ওয়ের ১০০০কি.মি. আর সিটিত ট্রাফিকের ৩০০-৪০০ কি.মি. ইঞ্জিন অয়েলকে সেইম পরিমান ক্ষয় করে। 

মানে ঢাকার সিটিতে চলা ৫০০কি.মি. আর হাই ওয়েতে চলা  ১২০০-১৩০০ চলা ইঞ্জিন অয়েল সেইম কন্ডিসন পাবেন।।

তাই মাস্ট  আমাদের দেশে, স্পেশালি ঢাকা  বা অন্য শহরে লো ড্রেন পিরিওড মানতে হবে  

 

♨️লো কোয়ালিটি মোটরসাইকেল এবং ইঞ্জিন অয়েল ঃ

দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশের বাইক গুলাই আসলে কোয়ালিটি ফুল না।৯০% বাইক ইন্ডিয়া বা চায়না মেইড।

ম্যাটারিয়েল কোয়ালিটি ভাল না, পিস্টন ডিউরাবিলিটি কম, এতে কিছুদিন চলতে না চলতে পিস্টন রিং গ্যাপ বেড়ে যায়।

এতে ব্লো বাই বেড়ে যায়,অয়েল খারাপ হওয়ার টেন্ডেন্সি বেড়ে যায়। দ্রুত অয়েল কমতে থাকে।


♨️ রাইডারদের একদম কমন টেকনিকেল নলেজের অভাব! ঃ

এটা একটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয়।৯৫% রাইডার ম্যানুয়াল পড়ে না, অথবা একটু ইউটিউব বা অন্য কোন সোর্স থেকে কমন জেনারেল জিনিস জানতে চায় না।

লং ড্রেন পিরিওডে ইঞ্জিন অয়েল চালানোর পূর্ব শর্ত হলো আপনাকে অয়েল লেভেল চেক করা জানতে হবে,।অয়েল কমলে টপ আপ করা করতে হবে। এটা অত্যন্ত সহজ কাজ। বাট এই সহজ কাজ ৯৫% রাইডার জাস্ট অনীহার কারনে জানে না। 

এতে লং ড্রেন পিরিওডে চালিয়ে ইঞ্জিন অয়েল কমে ইঞ্জিনের বাকি পার্টসের ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে তার খবরো থাকে না। 

অয়েল লেভেল চেক করা মাস্ট ১০০% রাইডারকে জানতে হবে। ম্যানুয়াল বা ইউটিউবে এইগুলা জানার সোর্স রয়েছে।   

♨️🩸 থিন ভিস্কোসিটির অয়েলঃ

আগের পোস্টে বলেছি সেইম গ্রেডের সব অয়েলের ভিস্কোসিটি সেইম থাকে না। আমাদের বাজারে যেইসব ফুল সিন্থেটিক অয়েল  আছে সেইগুলার ম্যাক্সিমাম থিন ভিস্কোসিটি অয়েল।

উদাহরণ হিসাবে ধরি Liqui Moly Street Race এবং Motul 7100 10w-40 কে। এর ১০০ ডিগ্রিতে ভিস্কোসিটি 13.6 cst. 

আগের পোস্টে বলেছি 

৩০ গ্রেড মানে = 9-12.5 cst রেঞ্জের অয়েল 

৪০ গ্রেড মানে 13-16.5 cst রেঞ্জের অয়েল

৫০ গ্রেড মানে = 16.6-22 cst রেঞ্জের অয়েল।

তাইলে দেখেন বোথ লিকুই মলি স্ট্রিট রেইস আর মটুল ৭১০০ ১০-৪০ গ্রেডের অয়েল গুলোর মধ্যে থিন ভিস্কসিটি রেঞ্জের অয়েল কারন 13.6 cst 

ইন্ডিয়ান চ্যানেল স্পোর্টস্টুরারে  এদের ল্যাবটেস্ট ভিডিও দেখলে জানতে পারবেন ৪০০০-৫০০০কি.মি. পর এদের ভিস্কোসিটি 10-10.5 cst লেভেলে চলে আসে।।মানে ৪০ গ্রেডের মধ্যেত নাইই, থিন হতে হতে ১০-৩০ রেঞ্জেরও থিন লেভেলে চলে আসছে। 

সো এইসব অয়েল আমাদের দেশে ৫০০০-৬০০০কি.মি. চালানো মানে ইঞ্জিন নিজ হাতে কিল করা! 

সো এইসব ফুল সিন্থেটিক অয়েল লো ড্রেন পিরিওডে চালাতে হবে যাতে ৪০ গ্রেড মানে 13cst এর নিচে না নামে। সোজা কথা ৩০০০ কি.মি. এর  নিচে   রাখতে হবে এদের ড্রেন পিরিওড। 

আর থিক রেঞ্জের অয়েল ইউজ করার ট্রাই করবেন।

ওকে,সব বুঝলাম। 🩺

😬😬😬‼️তাইলে বাইকের ম্যানুয়াল বা ইঞ্জিন অয়েল ম্যানুফেকচারার তাদের বুক লিস্টে ভুল লিখেছে? 

সবাই কমনলি বলবে "আপনে ম্যানুফেকচারারের চেয়েও বেশি বুঝেন?  🥴🥴"


উত্তর হলো,নাহ!  

তারাও ভুল কিছু বলে নাই।😁

ওরা যেই ড্রেন পিরিওড লিখেছে সেটা আদর্শ কন্ডিসন বিচার করে ড্রেন পিরিওড লিখেছে।

আদর্শ কন্ডিসন বলতে বুজাচ্ছে আপনি সঠিন Ron ভ্যালুর পিউর অক্টেন/পেট্রল ইউজ করছেন, সাথে নাতিশীতষ্ণ জ্যামমুক্ত পরিবেশে ধুলামুক্ত এলাকায় বাইক চালাচ্ছেন, সাথে আপনি অয়েল কমলে টপ আপ করছেন  এইসব বিবেচনায় রেখে এই ড্রেন পিরিওড সাজেস্ট করছে। 

যেটা বাস্তবিক পক্ষে আমাদের দেশের সাপেক্ষে কোন অবস্থায় পসিবলতো নাইই,ধারে কাছের কন্ডিসনেও নাই আমাদের দেশে।

বাইকের কোম্পানির ক্লেইমড মাইলেজও কিন্তু এইসব আদর্শ অবস্থা বিচার করে মাপা হয়,তাই ৭০/৮০ kmpl এমনকি অনেক বাইকে ১০০ kmpl মাইলেজ লিখে প্রতি ১ লিটার অক্টেনে 


বাট প্র‍্যাক্টিকেলী এর ধারে কাছেও পাওয়া যায় না।

একই ঘটনা ইঞ্জিন অয়েল ড্রেন পিরিওডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তাই মিনারেল অয়েল ১০০০-১৫০০কি.মি. আর ফুল সিন্থেটিক অয়েল ২০০০-৩০০০ রেঞ্জে চালাতে হবে। 

ইঞ্জিন যখন নতুনের দিকে থাকে তখন ব্লো বাই কম থাকার কারনে ইঞ্জিন অয়েল একটু লং ড্রেন পিরিওডে চালানো যায়, সো একটু ওল্ড হলে ড্রেন পিরিওড কমাতে হবে।

আর যারা হাই ওয়ে রাইড করেন,তারা সিটি রাইডের চেয়ে দেড় গুণ বেশি ড্রেন পিরিওড রাখতে পারবেন। 

আর টপ আপ করতে জানলে ড্রেন পিরিওড একটু বাড়াতে পারেন যদি লং রুটে চালান।

আজ এই পর্যন্তই।


____________________

লেখাঃ শাহেদ হাসান আবীর, FCB

No comments:

Post a Comment